Top Ad unit 728 × 90

আপনার বিজ্ঞাপনটি দিতে ইমেইল করুন - worldhindutimesbd@gmail.com

শিরোনাম

{getPosts} $results={6} $label={recent}

মির্জাপুর গণহত্যা: যেভাবে শহীদ হন দানবীর রণদা প্রসাদ সাহা


১৯৭১ সাৃলের ৭ মে। টাঙ্গাইলের মির্জাপুর বাজারের হাটবার হওয়ায় সকাল থেকেই লৌহজং নদী তীরবর্তী এলাকা ছিল ক্রেতা-বিক্রেতাদের ভিড়ে মুখর। কিন্তু সেই ব্যস্ত দুপুরই পরিণত হয় রক্তাক্ত এক ট্র্যাজেডিতে। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ও তাদের এদেশীয় দোসরদের হাতে সংঘটিত হয় মির্জাপুর গণহত্যা। একই দিনে অপহরণের পর হত্যা করা হয় দেশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ দানবীর ও মানবহিতৈষী ব্যক্তিত্ব রণদা প্রসাদ সাহাকে।


সেদিন দুপুর আনুমানিক দুইটার দিকে মির্জাপুর থানা শান্তি কমিটির চেয়ারম্যান আবদুল ওয়াদুদ ওরফে ওয়াদুদ মৌলানার নেতৃত্বে পাকিস্তানি সেনাদের একটি দল মির্জাপুর বাজারসংলগ্ন কুমুদিনী কমপ্লেক্সে অভিযান চালায়। এসময় তার ছেলে মাহবুবুর রহমান ও সহযোগী আবদুল মান্নানও অভিযানে অংশ নেয়।


হানাদাররা কুমুদিনী হাসপাতাল, ভারতেশ্বরী হোমস ও রণদা প্রসাদ সাহার বাড়িতে তল্লাশি চালিয়ে রণদা প্রসাদ সাহা ও তার ছেলে ভবানী প্রসাদ সাহার খোঁজ করতে থাকে। উপস্থিত চিকিৎসক, নার্স ও কর্মচারীরা জানান, তারা তখন মির্জাপুরে অবস্থান করছেন না। এরপরও পুরো হাসপাতাল এলাকা তন্নতন্ন করে খুঁজে হুমকি ও অপমান করা হয় চিকিৎসক, শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও কর্মচারীদের।


এর আগে একইদিন দুপুরে রাজাকারদের সহযোগিতায় পাকিস্তানি সেনারা লৌহজং নদীর তীরবর্তী হিন্দু অধ্যুষিত বাইমহাটি, সরিষাদাইড় ও আন্ধারা গ্রাম ঘিরে নির্বিচারে হত্যাযজ্ঞ চালায়। ঘাতকেরা নারী, শিশু ও বৃদ্ধসহ অন্তত ৩৩ জন নিরীহ গ্রামবাসীকে ব্রাশফায়ারে হত্যা করে।


গণহত্যার সময় পাশের পুষ্টকামুরী গ্রামের জয়নাল সরকারকে জীবন্ত পুড়িয়ে হত্যা করা হয়। মুক্তিযোদ্ধাদের তথ্য দেওয়ার অভিযোগে মাজম আলীকে জনসম্মুখে গুলি করে হত্যা করে পাকিস্তানি বাহিনী। হত্যাযজ্ঞ শেষে বাইমহাটি ও সরিষাদাইড় গ্রামের বহু বাড়িঘরে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়।


পরবর্তীতে শান্তি কমিটির চেয়ারম্যান আবদুল ওয়াদুদ গোপন সূত্রে জানতে পারেন, রণদা প্রসাদ সাহা ও তার ছেলে নারায়ণগঞ্জে অবস্থান করছেন। খবর পেয়ে তিনি ছেলে মাহবুবুর রহমান ও আবদুল মান্নানকে নিয়ে সেদিনই নারায়ণগঞ্জের উদ্দেশ্যে রওনা হন।


সন্ধ্যার পর স্থানীয় রাজাকারদের সহযোগিতায় পাকিস্তানি সেনারা নারায়ণগঞ্জের খানপুরে রণদা প্রসাদ সাহার বাড়িতে হামলা চালায়। এসময় রণদা প্রসাদ সাহা, ভবানী প্রসাদ সাহা, কর্মচারী রাখাল মতলব ও গৌর গোপাল সাহাসহ সাতজনকে ধরে নিয়ে যাওয়া হয় আদমজী বার্মা ইস্টার্ন অয়েল ডিপোতে। পরে সেখানে তাদের হত্যা করে লাশ শীতলক্ষ্যা নদীতে ফেলে দেওয়া হয়।


এর মধ্য দিয়েই নিভে যায় মানবসেবায় নিবেদিত এক বিরল মহাত্মার জীবনপ্রদীপ।

অতিদরিদ্র পরিবারে জন্ম নেওয়া রণদা প্রসাদ সাহার শৈশব কেটেছে চরম অভাবের মধ্যে। বিনা চিকিৎসায় ধনুষ্টংকারে মায়ের মৃত্যুর পর তিনি প্রতিজ্ঞা করেছিলেন, একদিন দরিদ্র ও অসহায় মানুষের চিকিৎসা ও শিক্ষার জন্য কাজ করবেন।


মাত্র ১৪ বছর বয়সে অভাবের তাড়নায় বাড়ি ছেড়ে কলকাতায় চলে যান তিনি। হাওড়া স্টেশনে পত্রিকা বিক্রি ও কুলির কাজ করেছেন। পরে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ চলাকালে বেঙ্গল অ্যাম্বুলেন্স কোরে যোগ দিয়ে ইরাকে যান। সেখানে অগ্নিকাণ্ড থেকে রোগীদের উদ্ধার করার ঘটনায় তিনি প্রশংসিত হন এবং বেঙ্গল রেজিমেন্টে কমিশন লাভ করেন।


দেশে ফিরে রেলওয়ের টিকিট কালেক্টরের চাকরি দিয়ে কর্মজীবন শুরু করলেও পরে ব্যবসায় নামেন। লবণ, কয়লা, নৌপরিবহন, পাট, চামড়া ও বিদ্যুৎ ব্যবসায় একের পর এক সফলতা তাকে ভারতীয় উপমহাদেশের অন্যতম ধনকুবেরে পরিণত করে।


কিন্তু সম্পদের মোহ তাকে গ্রাস করতে পারেনি। ১৯৩৮ সালে মা কুমুদিনী দেবীর নামে মির্জাপুরে প্রতিষ্ঠা করেন কুমুদিনী হাসপাতাল। নারী শিক্ষার প্রসারে ১৯৪৫ সালে গড়ে তোলেন ভারতেশ্বরী হোমস। এছাড়া কুমুদিনী নার্সিং স্কুল, মির্জাপুর কলেজ, এস কে পাইলট বিদ্যালয়সহ অসংখ্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করেন তিনি।


১৯৪৭ সালে নিজের সব ব্যবসা ও দাতব্য প্রতিষ্ঠান পরিচালনার জন্য গঠন করেন ‘কুমুদিনী ওয়েলফেয়ার ট্রাস্ট অব বেঙ্গল’। ট্রাস্টের আয়ের বড় অংশ ব্যয় হতো দরিদ্র ও অসহায় মানুষের কল্যাণে।


১৯৪৩ সালের দুর্ভিক্ষে তিনি রেডক্রস সোসাইটিকে তিন লাখ টাকা অনুদান দেন এবং পূর্ববঙ্গে আড়াইশরও বেশি লঙ্গরখানা চালু করেন। দেশভাগের সময় অধিকাংশ ধনাঢ্য হিন্দু পরিবার ভারত চলে গেলেও রণদা প্রসাদ সাহা মাতৃভূমি ছাড়েননি।


মুক্তিযুদ্ধের সময়ও তিনি মুক্তিকামী মানুষ ও মুক্তিযোদ্ধাদের পাশে দাঁড়ান। নিজের সম্পদ উন্মুক্ত করে দেন মানবসেবার কাজে। আর এ কারণেই পাকিস্তানি বাহিনী ও তাদের দোসরদের টার্গেটে পরিণত হন তিনি।


স্বাধীনতার দীর্ঘ ৪৮ বছর পর ২০১৯ সালের ২৭ জুন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল রণদা প্রসাদ সাহা ও ভবানী প্রসাদ সাহাকে অপহরণ ও হত্যার ঘটনায় রাজাকার মাহবুবুর রহমানকে মৃত্যুদণ্ড দেয়। তবে ২০২০ সালের অক্টোবরে মাহবুবুর রহমান মারা যাওয়ায় সেই রায় কার্যকর হয়নি। অন্যদিকে বিচার শুরুর আগেই মারা যান শান্তি কমিটির চেয়ারম্যান আবদুল ওয়াদুদ ও তার ছেলে আবদুল মান্নান।


তবে ইতিহাসের পাতা থেকে মুছে যায়নি রণদা প্রসাদ সাহার নাম। আজও তার প্রতিষ্ঠিত হাসপাতাল, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও জনকল্যাণমূলক উদ্যোগ মানবসেবার আলোকবর্তিকা হয়ে টিকে আছে বাংলাদেশের মাটিতে।

No comments:

অননুমোদিতভাবে কোনও বিষয়বস্তু অনুলিপি করা বা ব্যবহার করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ World Hindu Times All Right Reseved |

Contact Form

Name

Email *

Message *

Theme images by i-bob. Powered by Blogger.